ল ডেস্ক: ব্লগার আহমেদ রাজীব হত্যার রায় দিতে গিয়ে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক মো. সাঈদ আহম্মেদ তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, খুতবায় কী বক্তব্য দেওয়া যাবে তার একটা সীমা থাকা উচিত। কেউ কিছু লিখলেই তাকে মেরে ফেলতে হবে? আবার শুনেছি- ‘ব্লগাররাও এমন কিছু লেখেন যা পড়লে নাকি মারতে ইচ্ছে করে।’ আসলে আমরা সবাই ধৈর্যহারা হয়ে গেছি। সকলকেই ধৈর্য ধরতে হবে। রাজীব হত্যায় আনসারুল্লার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিচারক সাঈদ আহম্মেদ আরও বলেন, আমরা সবাই ধৈর্যহারা হয়ে গেছি। সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। আজকাল ক্রসফায়ারের নামেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আইন হাতে তুলে নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিচারক বলেন, এ মামলার অন্যতম আসামি মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানীর এ খুনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উনি আনসারুল্লাহ নামের একটি সংগঠনের প্রধান। রাষ্ট্রপক্ষ পরে তার কিছু জব্দ করা বই আদালতে জমা দিয়েছেন। রাহমানীর বক্তব্যের সিডি দেওয়ার কথা বলা হলেও সেটা দেওয়া হয়নি। তবে তিনি জমুার খুতবায় উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতেন বলে শুনেছি। অন্য আসামিরা সেগুলো শুনতেন। মামলায় কিছু বিচ্যুতির কথা তুলে ধরে আদালত বলেন, মামলার শুনানির সময় এমন প্রশ্নও এসেছে- তানজিলা নামের যে মেয়েটিকে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন তিনিই রাজীবকে হত্যা করেছেন কিনা। তার একটা জবানবন্দি নেওয়া প্রয়োজন ছিল তদন্ত কর্মকর্তার।
বিচারক আরও বলেন, মেধাবী ছাত্রদের আসামি করে মেধা ধ্বংস করা হচ্ছে বলে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি তুলে ধরেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেধাবীরাও এখন বিপথগামী হচ্ছেন। তারই একজন বন্ধু বিচারক (জজ) হিযবুত তাহরিরের সদস্য ছিলেন। পরে তিনি গ্রেফতার হন। এসব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বিচারক বলেন, আসামিদের সবাই ব্লগার বলে। আমি বলব না। কী লেখালেখির কারণে তারা উত্তেজিত হয়ে রাজীবকে মারলো সেটা পেপার-পত্রিকায় আছে। কিন্তু মামলার ফাইলে নেই। তিনি বলেন, রাজীব ছিলেন একা ও নিরস্ত্র। তানজিলা নামের একটি মেয়েকে মেসে পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফেরার পথে রাজীবকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী কোনও সাক্ষী নেই। আসামিদের একজন বাদে সবাই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মামলার অন্যতম প্রধান আসামি রেদোয়ানুল আজাদ রানা প্রসঙ্গে বিচারক বলেন, রানা শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। যিনি ছাত্রশিবিরের সদস্য ছিলেন। তিনিই এ হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা ও পরিকল্পনাকারী। তিনি অন্য আসামিদের বলেছেন- ব্লগার মারতে হবে।
বিচারক তার পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, রাজীব হত্যার জন্য রানার নেতৃত্বে দুটি টিম করা হয়। একটি টিম সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। অন্যটি তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে ছিল। বিচারক বলেন, যাকে হত্যা করা হয়েছে তিনি একজন প্রকৌশলী। যারা হত্যা করেছে তারাও ভবিষ্যৎ প্রকৌশলী। প্রকৌশলীরাই আরেক প্রকৌশলীকে পরিকল্পনা করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। বিচারক আরও বলেন, মামলার ফাইলে না থাকলেও আসামিরা তাদের স্বীকারোক্তির বক্তব্যে রাজীবকে ব্লগার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটি একটি পরিকল্পিত ও নৃশংস। এ হত্যাকাণ্ডে একেকজনের অংশগ্রহণ একেকরকম ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিচারক বলেন, আসামিরা সাজা কমানোর কোনও আবেদন বা দাবি করেননি। সবাই সরাসরি খালাস চেয়েছেন। কিন্তু এই আইনে কাউকে সরাসরি খালাস দেওয়ার সুযোগ নেই।
ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দ্বীপ কিলার দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন উল্লেখ করে বিচারক বলেন, তিনি চাপাতি দিয়ে রাজীবের ঘাড়ে আঘাত করেছিলেন। এছাড়া এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে যোগাযোগের জন্য তিনি মোবাইল ফোনের কিছু সিমকার্ড কিনেছিলেন। হত্যার জন্য চাপাতি কেনাকাটার দায়িত্বে ছিলেন মাকসুদুল হাসান অনিক। রাজীবের চলাচলের ওপর তথ্য সংগ্রহকারী দলে ছিলেন চারজন। তাদের তিনজন মো. এহসান রেজা রুম্মান, নাঈম শিকদার ইরাদ ও নাফিস ইমতিয়াজকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড, পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত। একই দলের অপর সদস্য সাদমান ইয়াছির মাহমুদকে তিন বছর কারাদণ্ড, দুই হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে দুই মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত। আর খুনি দলের প্রধান ও পরিকল্পনাকারী রেদোয়ানুল আজাদ রানা ও মূল খুনি হিসেবে ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দ্বীপকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। আর প্ররোচনাকারী হিসেবে মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানীকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড, দুই হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে দুই মাসের কারাদণ্ড দেন।
রায়ের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় রাজীবের বাবা ডা. মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, তিনি এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই রায় তিনি মানেন না। এটি প্রহসনের রায়। যে সমাজে বিচার বলতে কিছু নেই, সেই সমাজ ও জাতির কাছ থেকে কি আশা করতে পারি। এ ঘটনা ঘটিয়েছে জামায়াত-শিবির। এ মামলার অন্যতম আসামি রেদোয়ানুল আজাদ রানাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হলে এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য বের হয়ে আসতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানান ডা. নাজিম। ছেলে হত্যার বিচার চাওয়ার যে সংগ্রাম চলছে, সেটা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।