মাহমুদ হাসান খান: লবায়ু অভিযোজন তহবিলের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের শুদ্ধাচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার জলবায়ু তহবিল নিয়ে দিনব্যাপি এক আলোচনায় এসব কথা বলেন তারা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজন তহবিল : স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনঅংশগ্রহণ বিষয়ে ইন্টিগ্রিটি ডায়ালগ’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধি ও জাতীয় বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু অর্থায়নের বহুমুখী বিষয়গুলো এবং সুনির্দিষ্টভাবে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন অর্থায়ন বিষয়ে আলোচনা করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘প্যারিস চুক্তির প্রেক্ষিতে, বাংলাদেশ ও অন্যান্য জলবায়ু ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর অবশ্যই সম্মিলিতভাবে কাজ করা উচিত। একক ও সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শুদ্ধাচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসনের বহুমুখী ঘাটতি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে, অন্যথায় ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর অভিযোজন প্রচেষ্টা ভীষণভাবে ব্যাহত হবে।’
‘অভিযোজন’ শব্দটির সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের উল্লেখ করে বক্তারা একটি ব্যাপারে একমত যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অভিযোজনের ঝুঁকিগুলো ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর উন্নয়ন প্রচেষ্টায় বাড়তি চাপ ফেলছে। এছাড়া উন্নত দেশগুলোর সুষ্ঠু ও সময়াবদ্ধ প্রতিশ্রুতি না থাকা, অনুদানভিত্তিক জনতহবিলের অপ্রতুলতা, অভিযোজন প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় ঝুঁকির বিবেচনা না করা কিংবা সঠিক প্রয়োগ না করা এবং প্রকল্পের প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রকাশ না করা বিষয়ে বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণে স্থানীয় মানুষের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ না থাকা, অসন্তোষ প্রতিবিধানের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং অর্থায়ন ও হিসাবরক্ষণে জটিলতা ইত্যাদি বিষয়ে আরও গুরুত্ব সহকারে চিন্তার প্রয়োজন বলে বক্তারা অভিমত প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ সরকারের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল মাসুদ আহমেদ নিরীক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে আরও সময় লাগবে উল্লেখ করে জানান, তার অফিস এ পর্যন্ত শতাধিক জলবায়ু প্রকল্পের নিরীক্ষা সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেছে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী অংশে সম্মানিত অতিথি হিসেবে আরো বক্তব্য রাখেন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের টেকনিক্যাল পরামর্শক ও সেন্টার ফর গ্লোবাল চেঞ্জ (সিএফজি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান উদ্দিন আহমেদ।
সকালে অনুষ্ঠানের সূচনাপর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্যে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুতর প্রভাবের ফলে বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি সত্তর লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন তহবিলকে সুশাসনের দুর্বলতা থেকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে টিআইবি সদা সচেষ্ট।’
অনুষ্ঠানের প্রথমভাগে, ‘অভিযোজন অর্থায়নে সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা- প্যারিস চুক্তির পর তহবিলের অব্যাহত প্রবাহ’ শীর্ষক অংশে বক্তব্য রাখেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক ড. সালিমুল হক, কপ-২১ এ বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য ও কমিউনিটি ক্লাইমেট প্রজেক্ট, পিকেএসএফের সমন্বয়ক ড. ফজলে রাব্বি সাদেক এবং অ্যাডাপ্টেশন ফান্ড এনজিও নেটওয়ার্কের প্রধান বিশ্লেষক আলফা কানোগা। এই পর্বটি সঞ্চালনা করেন টিআইবি’র উপ-নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের।
এরপর ‘অভিযোজন অর্থায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনঅংশগ্রহণ: উন্নত দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গী’ শীর্ষক পর্বের সঞ্চালনা করেন অক্সফাম আমেরিকার সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার আনাকা পিটারসন কারভালহো।
এ পর্বে বক্তৃতা করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত, সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভাইরনমেন্টাল রিসার্চ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি; ড. টিমোথি মার্ক ক্যাডম্যান, রিসার্চ ফেলো, ইন্সটিটিউট ফর এথিকস, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ল, গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটি এবং সঞ্জয় বশিষ্ঠ, পরিচালক, ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক ইন সাউথ এশিয়া (ক্যানসা)।
তৃতীয় অধিবেশনে বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. এ. আতিক রহমানের সঞ্চালনায় ‘জলবায়ু অভিযোজন তহবিলে উন্নয়শীল দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গী’ শীর্ষক আলোচনা পর্ব চলে। এতে বক্তব্য রাখেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজান আর. খান, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এনামুল হক, জিআইজেড অফিস বাংলাদেশের ক্লাইমেট ফাইন্যান্স গভর্নেন্স প্রজেক্টের প্রিন্সিপাল অ্যাডভাইজর ড. বিয়োর্ন সারবোর্গ এবং অ্যাডাপ্টিফাই, নেদারল্যান্ডস এর ইয়ান টেলাম।